Buy Now

Search

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-১৬]

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-১৬]

মাগরিবের ওয়াক্ত ঘনিয়ে আসা মুহূর্তটা। মুসল্লিরা দলে দলে মসজিদে ঢুকছে। গোধূলি ছেঁয়ে আসা আসমানের নিম্নদেশ ঘেঁষে পাখিরা সারাদিন পর দল বেঁধে নীড়ে ফিরছে। ফারজাদ ফোন কানে অপেক্ষারত—দ্বিজা কী বলবে তা শুনতে। দ্বিজা কেমন একটা ক্ষোভের সাথে বলে উঠল, “ওয়াহিদ প্রত্যেকদিন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে, বলেছিলাম না সেদিন আপনাকে?ʼʼ
অন্য সময় হলে ফারজাদ নিশ্চিত বলত, 'প্রত্যেক দিন আবার কী? প্রতিদিন।ʼ তা বলল না, মেয়েটা অভিযোগ জানাচ্ছে, অভিযোগ জানাতেই কল করেছে! বেশ গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কেন দাঁড়িয়ে থাকে? সমস্যা কী ওর? কবে থেকে করছে এমন? এর বিরুদ্ধে কিছু বলিসনি কেন এতদিনে? জবান বন্ধ তোর? পাড়ার লোকে খুব ভালো বলে এতে?ʼʼ
ধমকে ওঠে ফারজাদ। দ্বিজা আবেশে চোখদুটো বুজে নিলো। ভারী একটা শ্বাস ফেলে বলল, “আমি কী বলব? আমার..ʼʼ
কথা শেষ হয় না। ফারজাদের কণ্ঠস্বর এবার একটু ক্ষ্যাপা লাগল, “আচ্ছা রাখ, দেখছি।ʼʼ
ফারজাদ সব ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত থাকতে পারলেও মেয়েদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের পেছনে লেগে থাকাকে প্রশ্রয় দেবার মানুষ না—তা জানে দ্বিজা। নিশ্চিত খারাপ কিছু তামাশা করে ফেলবে এবার। তবে সে সেজন্য তো জানায়নি এ-কথা। ফারজাদ কি বোঝে না, সে কী বোঝাতে চায়? দ্বিজা শুধু ফুফাতো বোন হিসেবে ফারজাদ কল কাটার আগ মুহূর্তে দ্বিজা বলে উঠল, “কাল ওদের বাড়ি থেকে দেখতে আসছে আমাকে।ʼʼ
কথাটুকু শেষ করতে কণ্ঠস্বরটা কেঁপে উঠল দ্বিজার। শেষের দিকে বিক্ষিপ্ত এক গাঢ় শ্বাস ছুটে যায় মেয়েটার বুক চিরে। ফারজাদ এক মুহুর্তের জন্য থমকে গেল, পরক্ষণেই হঠাৎ-ই বেশ উৎফুল্ল চিত্তে বলল, “আরে বাপরে! ওয়াহিদ মালটা তো দারুন এডভান্স! দেখ, একে বলে প্রেমিক। তোর পাত্তা না পেয়ে সরাসরি কাজের কাজ করতে চলে আসছে। তো কী? আমায়.. দাওয়াত করছিস নাকি? ডিউটির খুব চাপে আছি, আসতে পারব না এখন। একেবারে বিয়েতে আসব, যাহ! তো এত তাড়াতাড়ি বিয়ে করে ফেলবি? বলেছিলাম না, তোর বাপ ফিরলে বেশিদিন ঘরে রাখবে না তোকে, তবে পড়ালেখাটা কন্টিনিউ করিস।ʼʼ
দ্বিজার নিঃশব্দ কান্না বোধহয় ফারজাদ অবধি পৌঁছায় না। বুকে গাঢ় এক ক্ষত অনুভূত হলো দ্বিজার। বুকটা মুচরে, পিষে, ছি ন্ন ভি ন্ন হয়ে যাচ্ছে। উফফ, কী অসহ্য যন্ত্রণা! দ্বিজা কার কাছে জানাচ্ছে নিজের অন্যের হয়ে যাবার আগাম বয়ান? যার কোনো যায়-ই আসে না? সে বরং উৎসাহিত করছে। আজব ভালোবাসা তার, যেখানে অপরপক্ষের বিস্তর উপেক্ষা আর অবহেলার পরও তাকে ভালোবেসে যেতে হবে। দ্বিজা বুঝল না–তার কী হচ্ছে। তবে কেমন একটা ঘৃণা বিচ্ছুরিত হলো যেন নিজের জন্য! আর কতদিন, কতভাবে এই মানুষটাকে তার দুর্বলতার ফিরিস্তি দেবে সে, আর তারপর উল্টো উপেক্ষিত হবে? মানুষটা এমন কেন করে, সে জানে না। তবে আজ হঠাৎ-ই মনে অদ্ভুতুরে এক বিতৃষ্ণা টের পেল ফারজাদের নির্বিকার, দায়সারা, নির্লিপ্ত কথাগুলোর প্রভাবে। নিজের ওপর উপহাসের হাসি ঠোঁটে জমা হতেই চোখের নিচ গড়িয়ে জল পড়ল। নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা। ফারজাদ ফোনটা কানে চেপে ধরে চোখ বুজে বড়ো একটা টান দেয় সিগারেটে। ধোঁয়া উড়িয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কাঁদছিস কেন? চোখের পানি র ক্তে র চেয়ে মূল্যবান, মানুষ যেখানে একফোঁটা র ক্ত ঝরলে অস্থির, উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, সেখানে চোখের পানি কত সস্তা আর বেকার জিনিসের ক্ষয় করে দেয়।ʼʼ
দ্বিজার নিঃশব্দ কান্না এবার গোঙানির মতো শোনায়। ফারজাদ হতাশ এক শ্বাস ফেলল। ভারী নিঃশ্বাসের সাথে হালকা ধমকের মতো করে ডাকল, “দ্বিজা, দ্বিজা, দ্বিজা! থাম। কাঁদছিস কেন? আমায় একটা কারণ বলতো, আমায় ভালোবাসার? দ্বিজা, ভালোবাসা বলতে পৃথীবিতে কিছু হয়না। ক্ষণিকের একটা মায়াক্ষেত্র তৈরী হয় মাত্র, আর মায়া কেটে যায়–এ এক চিরন্তন সত্য। আচ্ছা! আমি তোকে আমি ভালোবাসলে তুই চিরসুখী হয়ে যাবি, তাই তো? তাই মনে হয় তোর? এত সহজ না জীবনটা, শোন আমার কথা..ʼʼ
ঘরে পদচারনার আওয়াজ পেল দ্বিজা। সেদিকে চোখ ফিরিয়ে তাকাতেই দুইজোড়া গম্ভীর আরেকটা দুঃখী চোখ তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা গেল। দ্বিজার ধ্বংসপ্রাপ্ত বিষাদে ঘেরা চোখ-মুখে উপচে পড়া কান্না, কানে ফোন। ফোনের ওপাশে এখনও এক পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে। হাবিব সাহেব ঝড়ের বেগে এগিয়ে এলেন, থাবা দিয়ে ফোনটা কেঁড়ে নিলেন দ্বিজা কান থেকে। স্ক্রিনে এখনও জ্বলজ্বল করছে ইংরেজি হরফে লেখা, 'Farjaadʼ নামখানা। সেখান থেকে চোখ ফিরিয়ে একবার দ্বিজার দিকে কঠিন মুখে তাকিয়ে তৎক্ষণাৎ সর্ব শক্তি দিয়ে ছুঁড়ে মারলেন ফোনটা মেঝেতে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দিলরুবা বেগম ও সদ্য এ বাড়িতে প্রবেশ করা লাবন্য ছিটকে দাঁড়ায় একপাশে। দ্বিজার প্রতিক্রিয়া ঠিক দুর্বোধ্য। বুঝতে পারা যাচ্ছে না–মেয়েটার কী হচ্ছে ভেতরে। হাবিব সাহেব চিৎকার করে বললেন,
“তুই কী করতেছিস, ঠিক বুঝে আসতেছে না আমার। ঠিক কোন নতুন উপায়ে নিজেকে খারাপ মেয়ে বানিয়েছিস? একদম নতুন পদ্ধতি। একজন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর হুট করে বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসার তারিখ দেয়। আর সেই দিনের আগের রাতে আরেক প্রেমিকের কাছে তার নালিশ জানিয়ে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছিস? তোরে ঠিক কোন নামে ডাকলে তোর চরিত্র বর্ণনা করা যাবে ঠিকমতো? এই তো আমার সম্মান রাখছিস দুই মা-মেয়ে!ʼʼ
কথা শেষ হলো কিনা, কষে একটা থাপ্পড় লাগালেন হাবিব সাহেব দ্বিজার গালে। মেয়েটার গালে লালচে দাগ স্পষ্ট হয়ে সবে গেল। ভেঙে খণ্ড হয়ে যাওয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই নষ্ট হবার যন্ত্র ফোন আমি কত শখ করে বিদেশ থেকে পাঠাইছিলাম তোর জন্য? শালা আমিই তো বোকা। তোর মা ভালোই করছে তো। নানির বাড়ি থাকছিস, আর..
আর বললেন না কিছু। ভারী পা ফেলে নীরব গর্জন করতে করতে দ্বিজার রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। দ্বিজার বুকের উঠা-নামা টের পাওয়া যাচ্ছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। জীবন এ কোথায় নিয়ে এলো তাকে, কী ঘটছে তার সঙ্গে? লাবন্য এগিয়ে এসে দাঁড়াল তার দিকে। তার গায়ে এখনও বোরকা জড়ানো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে সবে এসে পৌঁছেছে। যেহেতু ওরই শশুর বাড়ি থেকে দেখতে আসবে, আর তাছাড়াও দ্বিজার একটা সঙ্গর প্রয়োজন আজকের দিনে। বহুদিন পর মেয়েটা এসেছে ফুপুর বাড়ি। দিলরুবা বেগম যেন কিছু বলতে গিয়েও বললেন না, চরম অনীহার সাথে মুখ গম্ভীর করে চলে গেলেন। তিনি জানেন না, এর দায়ে তার সঙ্গে কী হতে চলেছে। লাবন্য বসল দ্বিজার পাশে। দ্বিজার চোখে এখনও বাধ মানে নি। অনবরত, অবিরাম ঝরছে নোনাজল। লাবন্য কিঞ্চিৎ শুকনো হাসিমুখে তাকিয়ে রইল দ্বিজার কান্নাজড়িতে ভাঙা মুখটার দিকে। তার কাছে কেন জানি মনে হচ্ছে আজে–আসল পাগলি তো এই দ্বিজাই! সে আসলেই ফারজাদকে ওসব ভালো-টালো কিছু বাসেন, শুধু একটু পছন্দ ছিল আর কী! ভালো তো বেসে ফেলেছে এই পাগলিটা! বেপরোয়া ভালোবাসা, এই পাগলির ভালোবাসা অদম্য, দুর্দমনীয়।
হাবিব সাহেব রুমে এসে হাতরে নিজের ফোন হাতে নিলেন। দিলরুবা বেগম পেছনে এসে দাঁড়ালেন তার, তার চোখে-মুখে ভাবনা–তাহলে লাবন্যর বিয়ের পরের দিন যে বড়োআপা দ্বিজা আর ফারজাদকে একঘরে দেখেছিল, সেটা অহেতুক ছিল না? সত্যিই কোনো সম্পর্ক আছে এদের মাঝে? তিনি নাহয় মেয়ের ভুলকে মেনে নিলেন হাবিব সাহেব ব্যাপারটাকে ঠিক কতটা খারাপ পর্যায়ে নিতে পারে, তা তিনি খানিক আন্দাজ করতে পারছেন। এর সম্পূর্ণ দায় এসে পড়বে তার ওপর। মায়ের বাড়ির অতি যাতায়াতকে কারণ বানিয়ে এই বদমেজাজি লোকটা এই জলকে কোথায় গড়াবেন কে জানে? ফারজাদকে এমনিতেও ভালো চোখে দেখেন না হাবিব সাহেব।
ফারজাদ কিছুটা হলেও আন্দাজ করেছে–কিছু একটা ঘটেছে। হঠাৎ-ই দ্বিজা থেমে গেল, কলটা কেটে গেল। এমনটা তো দ্বিজার করার কথা নয়! নাকি মেয়েটা ফারজাদের কথায় কষ্ট পেয়ে... তাহলেই ভালো। ভালো থাক পাগলিটা। এখন রাগ করলেও, পরে বুঝবে তার জন্য সঠিক কী? ফারজাদ জড়াবে না নিজেকে। কোনোভাবেই সংসারধর্ম অথবা মেয়েলোকের আঁচলে বাঁধা পড়বে না। সে জানে–সব মেয়ে এক না, তবুও তার ভেতরে অতি গভীরে লুকিয়ে থাকা আতঙ্ক আর ভয়টুকু কাটে নি আজও
মানুষের জীবনের সবচেয়ে খুশির অথবা অতি ধ্বংসের ঘটনাগুলো মস্তিষ্কে প্যানিক অথবা নিদারুন আতঙ্ক হিসেবে সংরক্ষিত থাকে, যা সেই ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত বিষয় পুনরাবৃত্তি ঘটার সুযোগ আছে, এমন ঘটনায় মস্তিষ্ক সক্রিয়ভাবে খুব বিরুদ্ধাচারণ করে। এটা এক প্রকার মানসিক রোগ। মানুষ কোনো রাস্তায় সড়ক দুর্ঘটনায় জখম হলে, সেই ক্ষত ভরে ওঠার পরেও পরবর্তিতে সেই রাস্তায় গেলে মস্তিষ্কে সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ খুব বাজেভাবে প্রভাব ফেলে। পুরোনো ব্যথাগুলো কোথাও একটা জেগে ওঠে। এটাকে বলে মস্তিষ্কের একটা অস্বাভাবিক মানসিক অবস্থা। যেটাকে প্যানিক অ্যাটাক বলা হয়। এতে মানুষ কোনো ঘটনায় হুটহাট আতঙ্কিত বা হতবিহ্বল হয়ে যায়।
আর যেখানে ফারজাদের জীবনে তো সেই ক্ষতির প্রভাব আজও বিদ্যমান। স্বপ্ন ও বৃত্তিহারা এক ব্যর্থ পথিক সে জীবনের পথে। এতগুলো বছর ধরে এই আতঙ্ক আর ব্যর্থতার হাহাকার তাকে এতটা কঠিন আর অস্বাভাবিক অনুভূতিহীন এক মানুষে পরিণত করেছে। ফারজাদের অবশ্য মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞও আছে রিজার্ভ। যার কাছে ফারজাদ মাঝেমধ্যেই যায়। তবে কিছু রোগের বাহ্যিকভাবে চিকিৎসার থাকে না। বিশেষ করে মনের গভীর ক্ষত অথবা অপূর্ণতার হাহাকার থেকে যে মানসিক রোগের সৃষ্টি, তাতে কোনো উল্লেখযোগ্য চিকিৎসা থাকে না সচরাচর।
ফারজাদের হাতের ফোনটা বেজে উঠল। বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে ছিল সে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে ভ্রুটা কুঁচকে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে যা আন্দাজ করেছে তা বোধহয় ঠিক। ফোন কানে লাগাতেই কর্কশ আওয়াজ ভেসে এলো, “তুমি যে অপদার্থ তা আরেকবার প্রমাণ না করলেই হতো না? নিজের জীবনটা তো নষ্ট করছো প্রেম কইরা, ছ্যাঁকা খাইয়া। লজ্জা করার দরকার ছিল না তোমার? তোমার ফুপু তো ফাজিল মহিলা, ছেলে মেয়ে দুইটারে তোমাদের বাড়ির সাথে কলিজা মিশায়ে মানুষ করছে, তার সুযোগ নিতে ভুলো নাই না? একে তো একজন পিছনে পড়ছে, রোজ রোজ বাড়ির সামনে আইসা দাঁড়ায়ে থাকতে থাকতে বিয়ের প্রস্তাব আনছে, তুমি আবার কি বিয়ে হবার আগেই নিয়া ভাগবা নাকি?ʼʼ
ফারজাদ চুপচাপ শুনছে। হাবিব সাহেব আবার গর্জে উঠলেন, “শোনো, ফারজাদ! আমার মেয়ের আশপাশ থেকে দূরে থাকবা। তোমাদের বাড়ির সাথে আগে যেমন আমার কোনো লেনদেন ছিল না, হবেও না। আর চেষ্টাও করবানা যোগাযোগ করার। আমি জানি তুমি কতবড়ো হারামি আর স্বার্থপর ছেলে। আমার মেয়েরে আশা দিবা, অথচ সুখে রাখতে পারবা না। এমনকি তুমি তো আশাও দিবার পারবা না। তুমি কি মানুষ নাকি? তোমারে চিনি না আমি? জা নো য়া রে র চামড়া গায়ে তোমার। মায়া দয়া, ভালো-মন্দের হিসাব আছে নাকি তোমার? মেয়েটারে কাঁদায়েও ঠিক পথরের মূর্তির মতোন ঘুরে বেড়াবা। এই জন্য তোমার ফুপু বোকা মহিলারে কইছিলাম–ওই শালার অমানুষের বসবাস করা বাড়ি থেকে আমার ছেলে মেয়ে দুইটারে যেন দূরে রাখে। তোমার এই শয়তানের মতোন শক্ত স্বভাবের জন্য তোমাদের ওই গোটা বাড়িটা অভিশাপে ভরা।ʼʼ
ফারজাদ কেবল হাসল একটু, “ফুপা, শয়তানের স্বভাব শক্ত হয়, তা জানতাম না।ʼʼ
হাবিব সাহেব এবার যেন মেজাজের খেঁই হারালেন, “তোমার মতো বদমাশের পরিবারের সাথে আমার আমার যে কোনো সম্পর্ক আছে এইডা ভাবতেও ঘেন্না হয় আমার। হারামি পরিবার!ʼʼ
ফোন কেটে ফোনটা ছুঁড়ে মারলেন বিছানার ওপর। দরজার কাছে সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দিলরুবা বেগম। হাবিব সাহেবের এই রাগ ওই বাড়ির ওপর আজকের নয়। ষোলোটা বছর ধরে পালন করছেন উনি। ষোলো বছর আগে হাবিব সাহেবের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। তবুও তার ব্যক্তিত্ব আর শিক্ষাগত যোগ্যতা দেখে বিয়ে দিয়েছিলেন দিলরুবা বেগমের বাবা। কিন্তু একটা সময় কর্মের আর কোনো ব্যাবস্থা হয়ে উঠল না তেমন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বিদেশ যাওয়ার। শশুরবাড়ির কাছে টাকা চেয়েছিলেন। যৌতুক হিসেবে নয়, ধার। যেটা তিনি উপার্জন করে আস্তে আস্তে শোধ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ফারজাদের বাবা আজাদ সাহেব টাকা না দিয়ে বরং কটুক্তি ঝারলেন, “যে দেশে থাইকা কোনো কর্ম খুঁইজা পায় নাই, অই আবার বিদেশ যাইয়া যেন কোটি মাল কামাইব। বিদেশ যাইয়াও কিছুই করতে পারবা না, বরং আমার আড়ৎয়ে খেটে খাও। কত মানুষ তোমার মতোন খাটতেছে প্রতিদিন। ওরে সংসারও চলে যাইতাছে বেশ, ওগোরে বিদেশ যাওয়া লাগতাছে না।ʼʼ
সেই কথা তিনি ভুলতে পারেন না। এরপর মায়ের টুকটাক পুরাতন গহনা, দিলরুবা বেগমের হাতে বালা, দুল এক অংশ জমি বিক্রি করে কোনোমতো গেলেন বিদেশ। আল্লাহর রহমতে আস্তে আস্তে তিনি চোখে পড়ার মতো উন্নতির দেখা পেয়েছেন, তবে মেজাজি, তেজ্বী লোক হওয়ায় অপমান করে বলা সেই কথা ভুলতে পারেন নি।
লাবন্য দ্বিজার ঘরে বসে শুনল সবটা। কোনো কথা বলল না। দ্বিজার চোখের পানি শুকিয়ে লেপ্টে আছে চোয়ালে। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ভার ছেড়ে দিয়ে বসে আছে বিছানার ওপর। জীবনটা আসলেই জটিল, ভয়াবহ এক কুরুক্ষেত্র। যেখানে বাঁচতে হলে লড়তে হবে। কখনও আশপাশের পরিস্থিতির সঙ্গে, তো কখনও নিজের মনের সঙ্গে। এ আজীনের লড়াই।
ফারজাদ কান থেকে ফোন নামিয়ে নিজের মনেই হেসে উঠে বিরবির করে বলল, “তোর বাপ কত ভালোভাবে চেনে আমায়, অথচ তুই বুঝিস না, দ্বিজা! তোর বাপের কাছে একটু জানলেও তো পারিস কত জঘন্য এক ব্যক্তিত্ব আমি।ʼʼ
চলবে..

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy