Buy Now

Search

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-১৮]

তপ্ত সরোবরে [পর্ব-১৮]

আপনাকে কে বলল আমি ফারজাদ ভাইয়াকে পছন্দ করতাম?ʼʼ
“আগের কথা ছাড়ো, এখন তো তুমিই বলছ।ʼʼ
লাবন্য নাক কুঁচকায়, “আমি বলছি?ʼʼ
“বলছ না?ʼʼ
লাবন্য গম্ভীর মুখে নাক শিউরে তাকিয়ে রয়। ইরফান ঠোঁট চেপে হেসে বলল, “মাঝরাতে এসব অলক্ষুনে প্রশ্ন না করে একটু রোমান্টিক কথা বললেও তো পারো।ʼʼ
লাবন্য অপ্রস্তুত হয়ে চোখ বড়ো করে তাকাল। এরপর রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে রইল ইরফানের দিকে। ইরফান লাবন্যর চোখের দিকে এবার পূর্ণদৃষ্টি মেলে তাকাল, ঘাঁড় নেড়ে ভ্রু নাচিয়ে চমৎকার ভঙ্গিতে বলল, “কী হয়েছে? কী জানতে চাও? ফেলে আসা কাল নিয়ে আমার কোনো লেনদেন নেই। ফেলে আসা সেই অতীতকে ধরে রাখা যায় যার পরিণতি বর্তমানে প্রভাব ফেলছে। তুমি তো মুভ অন করেছ, লাবু! ইনফেক্ট, স্বামী-স্ত্রী হবার আগে আমরা কিন্তু বন্ধু, এটা ভোলা যাবে না। আর বন্ধু হিসেবে তোমার চোখের ভাষা পড়াটা খুব কঠিন ছিল না আমার জন্য। মোরওভার, বন্ধু হিসেবে আমার রিয়্যাকশনটাই বা কেমন হওয়া উচিত ছিল? নিশ্চয়ই তোমায় সান্ত্বণা দেয়া, সঙ্গ দেয়া এবং সেই কষ্ট ভুলে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা যোগানো? যা আমি করতে পেরেছি কিনা জানিনা, তবে চেষ্টা থাকবে সবসময়।ʼʼ
লাবন্য অভিভূত নজরে তাকিয়ে ছিল এতক্ষণ ইরফানের দিকে। ইরফান কথা থামাতেই আনমনে প্রশ্ন করে উঠল, “আর স্বামী হিসেবে? স্বামী হিসেবে কিছু বলার নেই?ʼʼ
শব্দ করে শ্বাস ফেলল ইরফান। লাবন্যর দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিয়ে আস্তে করে বলল, “উহু! তখন তো আর আমি ছিলাম না। আর প্রেমে পড়ার বয়সও তোমার পেরিয়ে যাচ্ছিল। সে হিসেবে দোষটা আমারই, আমি তোমার লাইফে আগে এন্ট্রি মারলে আর ফারজাদ বাবুর প্রেমে পড়ার সুযোগ পেতে না। আমিও তো করেছি প্রেম, কারণ তখন তুমি ছিলে না। শোধ গেছে।ʼʼ
বলেই চোখ মারল ইরফান, তার সহজ হাসিটা ঠোঁটে ঝুলছে। লাবন্য অবাক হয়। একটা মানুষের সর্বক্ষণের অভিব্যক্তি সকল কিছুর পরিপেক্ষিতে এত সহজ কী করে হয়? সবকিছু মেনে নেয়ার ভয়ানক শক্তিধর এই মানুষটা। সব কিছুর সহজ ব্যাখ্যা আছে তার কাছে। লাবন্য মুচকি হাসল। বারান্দার রেলিংয়ে হাত প্রসারিত করে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাস্যজ্জ্বল কণ্ঠে উদাসী গলায় জিজ্ঞেস করল, “আপনি সত্যিই প্রেম করেছেন আগে?ʼʼ
ইরফান তড়াক করে ঘাঁড় ঘুরিয়ে লাবন্যর দিকে তাকায়। ঝরঝরে একটা হাসি দিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “আর ইউ জেলাস, লাবু?ʼʼ
কথাটা শেষ করে দুষ্টু প্রানখোলা হাসিতে মেতে উঠল ইরফান। হঠাৎ-ই হাসি থামিয়ে ছোটো বাচ্চাদের মতো আবদার করার ভঙ্গিতে বলল, “একটা সিগারেট খাই? একটা মাত্র। তুমি চাইলে তোমাকেও দু-এক টান মারতে দেব, সত্যি!ʼʼ
লাবন্য চোখ সরু করে তাকাল। ইরফান বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বলল, “এই জন্য বলতাম, ব্যাচলর লাইফ ইজ বেস্ট।ʼʼ
একটু চুপ থেকে আবার বলল, “এই, তোমাকে বলেছি না–আমায় 'আপনিʼ ডাকবে না। তোমার এই ডাকে, বউয়ের কাছে ভরা যৌবনের কালটা বুড়ো বুড়ো লাগলে এটাও এক ধরণের ছ্যাঁকা। তুমি তোমার এই ডাক দিয়ে আমার দুই যুগ বয়স বাড়িয়ে দিচ্ছ দিন দিন।ʼʼ
লাবন্যর ভ্রু কুঁচকায়। সে সবসময় বলতে পারে না ঠিকই। তবে মাঝেমধ্যেই তুমি সম্বোধন করে ফেলে। তা কি এই লোকের হিসেবে শামিল হয় না? এর ঢঙ দেখে লাবন্য আজকাল খুব হাসে, বারবার হাসে, প্রায় সবসময় হাসে। তার মনে হয়–ভাগ্য ততটাও নির্মম নয়, যতটা কঠোর ক্ষেত্রবিশেষ মনে হয়। নিজেকে এবং পরিস্থিতিকে সময় দিতে হয়। সৃষ্টিকর্তা একাধারে শুধু মানুষকে নিরাশ করেন না মোটেই। কিছু কেড়ে নিলে কোথাও না কোথাও কিছু দেনও বটে! এটাই তবে তার ইনসাফ! লাবন্যর নিজেকে সুখী-সুখী লাগে আজকাল খুব। সাথে অজানা ভয় চড়ে উঠছে কোথাও–মুক্তমনা, প্রাণোচ্ছল এই মানুষটিকে হারিয়ে ফেলার।

দ্বিজার রাতটা কেটেছে নিজেকে বোঝাতে। সে বুঝিয়েছে নিজেকে, ইরফানের বলা কথাগুলোকে বিশ্লেষন করেছে, তার সঙ্গে নিজের অনুভূতির সমীকরণ তৈরী করেছে, সবশেষে–ফারজাদের প্রতিক্রিয়াকে সামনে রাখায় সবটা মুচরে পিষে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। নিজের সঙ্গে এই একরাত ত্যাগের যূদ্ধ চালিয়ে সে ছেড়ে দিয়েছে ফাদজাদকে তার জায়গায়। নিজেকে শাসিয়েছে—আর লাগবে না ফারজাদকে।
মানসিক যন্ত্রণা পীড়া দিলে মানুষ সচরাচর ঘুরেফিরে সৃষ্টিকর্তার শরণাপন্ন হয়, বেজায় শান্তিদায়ক স্থান সিজদার জায়গাটা। ফজরের আজানের ধ্বনি শোনা গেলে উঠে গিয়ে ওযু করে এসে ফজরের নামাযে বসে যায় দ্বিজা। এরপর অসহ্য মাথা ব্যথায় কাতর হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল, তখন প্রকৃতিতে আলো ফুটে উঠেছে।
বেলা দশটার দিকে দিলরুবা বেগমের দরজা ধাক্কানিতে উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলো দ্বিজা। আব্বু ডেকেছে তাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওড়নাটা ভালোভাবে শরীরে পেঁচিয়ে আম্মুর পিছু পিছু অপ্রতিভ পায়ে হেঁটে ডাইনিং রুমে গিয়ে উপস্থিত হলো। ওর দিকে না তাকিয়েই হাবিব সাহেব শক্ত গলায় বললেন, “খেতে বসো।ʼʼ
দ্বিজার খেতে ইচ্ছে করছে না, তবুও ক্ষীণ হাতে চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসে খেতে বসে গেল। খেতে খেতে হঠাৎ-ই হাবিব সাহেব প্রশ্ন করলেন, “এখন তোমার মতামত কী? ওয়াহিদের চাচা কল করছিল সকালে। ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেও।ʼʼ
“সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি। বিয়ে করব না।ʼʼ
আবার যেন ধপ করে জ্বলে উঠলেন হাবিব সাহেব, “বিয়ে করবা না, তো কী করবা? আমার মান সম্মান নিয়ে ডুগডুগি খেলবা? অপদার্থ মেয়ে! পাত্রপক্ষের সামনে খুব নিজের মতামত জানাতে শিখছ না? এই পাত্র গেলে তোমার তো বিয়েই হবে না। তোমার মতো অপদার্থ, অবাধ্য মেয়েরে কেউ ঘরে তুলবে? কী করবা ভাবছ? ওই আমার শ্যালকের ছেলের সাথে ভাগবা? আমি তোমারে টুকরা করে কেটে পানিতে ভাসায়ে দেব...
বাইরে গেট খোলার শব্দ এলো। হাবিব সাহেব একবার তাকালেন সেদিকে। আবার ফিরে বলতে লাগলেন, “তুই চাস বা না চাস তোর বিয়ে এইখানেই হবে। তোর মতো মেয়ের মন্তব্যে পরোয়া নাই আমার।ʼʼ
ফারজাদ এসে দাঁড়াল খাওয়ার টেবিলের থেকে একটু দূরে। দ্বিজা বিস্মিত নজরে তাকায় সেদিকে, গলায় আটকে যাওয়া ঢোকটা গিলে নেয় বুকের ধুকপুকানির সাথে। যেই মানুষটার বিরহে সে আজ সে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রায়, সেই মানুষটা এসে দাঁড়াচ্ছে সামনে এমন এক সংকটাপন্ন সময়ে! হাবিব সাহেব ভ্রু কুঁচকে ক্ষিপ্ত নজরে তাকায় ফারজাদের দিকে, “তোমার মতলব কী? আমার বাড়িতে আগুন লাগায়ে মন ভরেনি? এবার আবার তামাশা দেখবার আসছ? তোমার মতোন অপদার্থের কাছে আর আশাই বা কী করা যায়? জীবনে করছটা কী? মানুষের চামড়া আছে নাকি তোমার বাড়ির কারও গায়ে? তোমার বাপের কাছে জীবনে মানুষ ভালো কিছু পায়নি, তোমার কাছে কী আশা করা যায়? নিজের জীবনটারেই তো গোল্লায় দিছো। দেখলে তো মেশিন ছাড়া আর কিছু লাগে না। সেই কালে অকাম-কুকাম করে নিজের জীবনের খেলা সাঙ্গ করছ, এখন আর কাউরে ভালো থাকতে দেখতে মন চায়না? আমার মেয়ের পিছনে লাগছ এখন?ʼʼ
বলতে বলতে হাবিব সাহেব এগিয়ে গেলেন ফারজাদের দিকে। ফারজাদ নীরব-নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে আছে। আস্তে করে মাথাটা নামিয়ে নিয়ে বলল, “ফুপা, মিস-আন্ডার্স্ট্যান্ডিং হচ্ছে আপনার। আপনি শুধু শুধু দ্বিজার ওপর..ʼʼ
এবার তেড়ে গেলেন হাবিব সাহেব গজরাতে গজরাতে ফারজাদের দিকে, “তুমি শিখাবা আমায় কোনটা ভুল? তোমার বাপে আমারে বলছিল–আমি নাকি জীবনে কিছূই করতে পারব না। তুমি কী করছ? কিচ্ছু করতে পেরে শেষমেষ পুলিশের চাকরি করবার লাগছ? সে তুমি যা খুশি করো। আমার মেয়ের থেকে দূরে থাকবা। তোমার পরিবারের কোনো লোকের ছায়াও যেন আমার বাড়ির উপরে না পড়ে।ʼʼ
ফারজাদ কিছুসময় শীতল নজরে তাকিয়ে থেকে বলল, “ফুপা, এখানকার বিষয়টা এগুলো না। আপনি পুরোনো কথা নিয়ে এত ক্যাচক্যাচ করছেন। হয়েছে কী সেটা শুনতে এসেছি।ʼʼ
“এত ভোলাভালা সাজছ কেন? জানো না কী হইছে, হ্যাঁ? তোমার বিরহে কেউ বিয়ে শাদি বাদ দিয়ে সন্ন্যাসীনী হবার পথে, আর তুমি জানো না কী হইছে?ʼʼ
“দ্বিজা বিয়ে যখন বিয়ে করতে চাইছে না, তখন আপনিই বা জোর করছেন কেন? পড়ালেখা করুক, বিয়ে বয়স তো আর পেরিয়ে...ʼʼ
“চুপ করো বলতেছি, আর একটা কথাও বলবানা তুমি। তোমার থেকে পরামর্শ চাইছি আমি? আমার বাড়িতে আগুন লাগায়ে এখন আবার আসছ শুকনো খড় ছুঁড়তে? কে তুমি হে?ʼʼ
“আমি ফারজাদ। দ্বিজার মামাতো ভাই।ʼʼ
“তাই নাকি? মামাতো ভাই? এই জন্য পাত্রপক্ষের সামনে নির্লজ্জের মতোন 'নাʼ করে মেয়ে?ʼʼ
“তাহলে ও নিজের মতামত জানিয়েছে, এখানে আমি মামাতো ভাই হওয়া না হওয়াতে যায়-আসে কী, ফুপা?ʼʼ
“তুমিই তো ভরকাইছ। এখন ভালো মানুষ সাজছ? তোমারে চিনি না আমি? অপদার্থ, হারাম*খোঁড় কোথাকার! আমার মেয়েরে তুমি না উশকানি না দিলে এমনে এমনেই এত দূর গেছে সে? তুমি বলবা আমি মেনে নেব? সাধু পুরুষ তুমি? তোমার গোটা পরিবাররে চেনা আছে আমার। এই জন্য ওই মহিলারে কইছিলাম ওই বাড়িত আমার মেয়েরে নিয়া যাইস না। খুব ভালো মানুষ সাজতে আইছ আজ...ʼʼ
ফারজাদ একদম শান্ত। তার চোখে-মুখে অস্পষ্ট এক নিস্প্রভতা বিরাজ করছে। হয়ত পুরোনো দিনের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা ঠেলে আসছে মস্তিষ্কে। পুরোনো কোনো হৃদয় ছিন্নভিন্ন করা ঘটনার পুনরাবৃত্তির ভয় পাচ্ছে ছেলেটা। সেরকমই কিছু একটা ঘটতে চলল আজও। ফারজাদ ক্ষীণ স্বরে দমে যাওয়া কণ্ঠে কেবল বলল, “আপনার ভুল হচ্ছে, ফুপা!ʼʼ
এবার হাবিব সাহেব অবাঞ্ছিত এক কাজ করতে উদ্যত হলেন। তেড়ে গিয়ে অকথ্য ভাষায় বকে উঠে হাত উঠালেন ফারজাদের ওপর। মুখে বললেন, “আমার ভুল হচ্ছে, হারামির বাচ্চা!ʼʼ
অথচ ওনার হাত ফারজাদ অবধি পৌঁছায় না। মাঝখানে এসে যোদ্ধার হাতের ঢালের ন্যায় দাঁড়িয়ে পড়ল দ্বিজা। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট জলন্ত ক্ষোভ। খপ করে ফারজাদের পেশিবহুল হাতটা চেপে ধরল নিজের ছোট্ট হাতের তালুতে। একটু জোর প্রয়োগ করে ফারজাদকে পিছিয়ে নিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে যায় একদম ফারজাদের সামনে আব্বুর মুখোমুখি। জলন্ত গলায় বলল, “খবরদার আব্বু, ফারজাদের গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করবেন না। অনেকক্ষণ ধরে যা নয় তা বলে যাচ্ছেন। আপনি সম্মান বলতে কী বোঝেন? আপনার সম্মান আছে আর কারও নেই? ফারজাদ ছোটো বাচ্চা? আপনি ওর গায়ে হাত তুলতে যাচ্ছেন। অন্তত ততক্ষণ এরকম কিছুই হবে না, যতক্ষণ এখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি।ʼʼ
দ্বিজার গলাটা কেঁপে ওঠে কিঞ্চিৎ। পরিবেশটা থমথম করছে। ফারজাদ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একদৃষ্টে ছোট্ট এই তেজস্বিনীর দিকে তাকিয়ে। তার ভেতরে কোথাও বহুদিনের দাঁড়িয়ে থাকা দ্বিধার দেয়ালটায় ধাক্কা লাগছে বোধহয়! এই পুচকি মেয়ে এসে দাঁড়িয়েছে তার মতো একটা এসবিআই অফিসারের সামনে নিজের বাপের মোকাবেলায়! দ্বিজা চিৎকার করে উঠল, “আব্বু! কী মনে হয় আপনার? যত ঠিক বুঝ, যত বাস্তব জ্ঞান আপনারই আছে? আমি বলছি আপনি শুধুই একটা গোমরা, অহংকারী লোক। আর আপনার অহংকার আপনাকে অন্ধ করে রেখেছে। তাই তো ঠিক ভুল বাছ-বিচারের পরোয়া না কোরে মনগড়া অপবাদের দায়ে নিজের পুরাতন ক্ষোভ মিটাচ্ছেন!ʼʼ
হাবিব সাহেব এবার নিয়ন্ত্রণ হারালেন। দ্বিজার গালে সজোরে একটা থাপ্পর মারলেন। দ্বিজার মাঝে ভয় বা সংকোচের চিহ্ন প্রকাশ পেল না। আগের চেয়ে আরও দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “মারেন, আরও কয়েকটা থাপ্পর পাওনা আমার। এই যে এতদিন আপনাকে ভুল বুঝতে দিয়েছি। আপনার যা ইচ্ছে ভেবে বসে আছেন। কী মনে হয় আপনার? আপনি যা ভাবেন শুধু তাই-ই ঠিক?ʼʼ
“দ্বিজা চুপ কর নয়ত..ʼʼ
“নয়ত কী? নয়ত কী, আব্বু?ʼʼ
হাবিব সাহেব দ্বিজাকে পার করে এবার ফারজাদের দিকে আক্রমনাত্মক চিত্তে এগিয়ে যায়, দাঁতের মাড়ি চেপে বলতে লাগলেন, “তোর এসব স্পর্ধা আসে কোত্থেকে। তোর মাথাটা খাইছে এই অসভ্য, হারামি! যার ভিতরে মানুষের রক্ত-মাংসই নাই, ওর থেকেই তো শিখছিস এসব? এই জন্য এত প্রেম?ʼʼ
দ্বিজা ক্ষ্যাপাটে সিংহীর মতো গর্জে উঠল, থামেন আপনি! আপনার কাণ্ডজ্ঞানের খুব অভাব, আব্বু! আপনি বারবার ফরজাদের দিকে এগিয়ে যাবেন না, বলছি। আমি মাঝখানে আছি আমায় মারতে পারছেন না? ও কী করেছে? ভুল করেছি আমি, যা সব কিছু করেছি, সব আমি। এই কথাটা মাথায় ঢুকছে না আপনার? পরের ছেলের গায়ে হাত তুলতে যেতে এবার সম্মানে বাধছে না আপনার? আমি আছি তো আপনার সামনে, মারেন আমায়। আমায় মারেন!ʼʼ
শেষের কথাটা দ্বিজা সমস্ত গলার জোর দিয়ে বলে ওঠে। হাবিব সাহবে হঠাৎ-ই চুপ মেরে গিয়ে বিস্ময় ও ক্রোধে একাকার হয়ে কেবল ঝলসানো চোখে তাকিয়ে রইলেন দ্বিজার দিকে। ফারজাদ নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে। তার ভেতরে তোলপাড় চলছে। একদৃষ্টে কেবল সবটুকু মনোযোগ ধরে রেখেছে সে দ্বিজার ওপর। দ্বিজা কয়েকবার জোরে জোরে শ্বাস নিলো। তার চোখে জমে থাকা পানিটুকু টুপ করে গড়িয়ে পড়ে এবার গাল বেয়ে। মুখ তুলে এবার অদ্ভুত শান্ত স্বরে বলতে শুরু করল,
“আব্বু! আপনি জানেন না, আপনি কত বড়ো ভুলের মাঝে আছেন। আপনার কী মনে হয়–এই লোকটা আমার প্রেমিক?ʼʼ
কান্নামিশ্রিত স্বরে কথাগুলো বলতে বলতে হঠাৎ-ই মলিন হাসল দ্বিজা। আবার বলল, “যন্ত্রণা আব্বু! ফারজাদ যন্ত্রণা আমার। যাকে আমি সেই কবে থেকে নিজের ভেতরে খুব আদরে পালন করছি। আপনি বোঝেন না–এই লড়াই আমার একার? আব্বু আপনি কার ওপরে আঙুল উঠাচ্ছেন প্রেমের দায়ে? যে মানুষটার অস্বীকৃতিতে আজ এই হাল আমার? আপনি অপবাদ দিচ্ছেন তাকে, আব্বু!ʼʼ
দ্বিজার কথাগুলো শুনতে উপহাসের মতো লাগে। যেন সে নিজেকে উপহাস করছে, উপহাস করছে ফারজাদকে, উপহাস করছে আব্বুর ধারণাকে।
“আমি ভালোবাসি ফারজাদকে আব্বু! ফারজাদ তো কোনোদিন কোমল নজরেও তাকায়নি আমার দিকে। আমি ভালোবাসি ফারজাদকে–এর চেয়ে এ ব্যাপারে আর একটা শব্দও বেশি নেই। এরপর আর কিছুই না, আব্বু!
এ পর্যন্তই। আজ অবধি যা হয়েছে সবটা আমার একার এই নির্লজ্জ অনুভূতির জোরে।ʼʼ
হাবিব সাহেব তাকিয়ে আছেন মেয়ের মলিন অশ্রুসজল মুখটার দিকে। হুট করে জ্বলে উঠলেন যেন, এগিয়ে এলেন হুড়মুড়িয়ে, “তাহলে ও এখানে কী করতেছে, আমার বাড়ির মান-সম্মান, শান্তি, আমার সুখ সব খাইছে। ওরে তো..
সজোরে ধাক্কা দিতে যান তিনি ফারজাদকে। দ্বিজা একহাতে ফারজাদের হাতটা ধরে অপর হাতে হাবিব সাহেবের বাহুতে ধাক্কা দিয়ে নিজে ফারজাদকে নিয়ে একটু পিছিয়ে যায়। যেন ফারজাদ একটা বাচ্চা ছেলে, তাকে নিরাপত্তা দেয়া অবশ্য কর্তব্য দ্বিজার। ফারজাদ মোটেই চেষ্টা করছে না নিজেকে বাঁচাতে। সে তলিয়ে যাচ্ছে কোথাও। যে তলে ডুবছে সে, সেই সরোবরের গভীরতা নেই। অতীতের বিষাক্ত অভিজ্ঞতার স্মৃতিমূলক তীরটা বুকে আঘাত করছে, তো আবার বর্তমানের এই আশাতীত দৃশ্য তাকে প্রবল শক্তিশালি স্রোতের ন্যায় ভিজিয়ে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দূর অজানায় কোথাও!
চলবে...

Olindo Rahman

Olindo Rahman

A good book is worth a hundred good friends. 
But a good friend is equal to a library.!! 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Your experience on this site will be improved by allowing cookies Cookie Policy